কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অতি গুরুত্বপূর্ণ

মিশরের “ভ্যালি অব দ্য কিংস”-এ তামিল-ব্রাহ্মী শিলালিপি: প্রাচীন তামিলগম–রোমান বিশ্বের বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের নতুন প্রমাণ

মিশরের থিবান নেক্রোপলিসে “ভ্যালি অব দ্য কিংস”-এর কয়েকটি সমাধির ভিতরে তামিল-ব্রাহ্মী, প্রাকৃত ও সংস্কৃত ভাষায় প্রায় ৩০টি শিলালিপি শনাক্ত হয়েছে, যেগুলোর সময়কাল ১ম থেকে ৩য় শতাব্দী সিই। ২০২৪–২৫ সালের মাঠসমীক্ষায় গবেষকেরা এগুলো নথিভুক্ত করেন। শিলালিপিগুলো ভ্রমণকারী/ব্যবসায়ীদের নাম-লেখা গ্রাফিতি—যা রোমান যুগে ভারতীয়দের মিশরের ভেতরাঞ্চলে উপস্থিতির বিরল প্রমাণ দেয়।

মিশরের “ভ্যালি অব দ্য কিংস”-এ তামিল-ব্রাহ্মী শিলালিপি: প্রাচীন তামিলগম–রোমান বিশ্বের বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের নতুন প্রমাণ

১) আবিষ্কারটি কী এবং কেন আলোচনায়

এই আবিষ্কারের মূল তাৎপর্য হলো—এটি দেখায় যে প্রাচীন দক্ষিণ ভারতের তামিলগম (Tamilagam) অঞ্চল এবং রোমান বিশ্বের সঙ্গে শুধু সমুদ্রবন্দরভিত্তিক বাণিজ্যই ছিল না; বরং সেই যোগাযোগের ছাপ মিশরের নাইল উপত্যকার ভেতর পর্যন্ত পৌঁছেছিল। “ভ্যালি অব দ্য কিংস” সাধারণত রাজকীয় সমাধিক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। সেখানে ভারতীয় ভাষার গ্রাফিতি পাওয়া মানে রোমান যুগে ভারতীয় ভ্রমণকারী/ব্যবসায়ীরা কৌতূহল বা দর্শনার্থী হিসেবে এই স্থানগুলোতে গিয়েছিলেন—এ ধারণা আরও জোরালো হয়।

২) কোথায় মিলেছে, কী ধরনের লেখা

লেখাগুলো পাওয়া গেছে মিশরের থিবান নেক্রোপলিস এলাকার “ভ্যালি অব দ্য কিংস”-এর ৬টি সমাধি জুড়ে—দেয়াল ও করিডোরে। এগুলো মূলত ছোট ছোট গ্রাফিতি (নাম বা সংক্ষিপ্ত বাক্য), যেন কেউ ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে নিজের উপস্থিতির চিহ্ন রেখে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই জায়গায় আগে থেকেই গ্রিক ভাষায় হাজার হাজার গ্রাফিতি পাওয়া যায়—অর্থাৎ বহুভাষিক “ভিজিটর গ্রাফিতি” সংস্কৃতি সেখানে ছিল। ভারতীয় ভাষার গ্রাফিতি সেই বহুভাষিক ধারাবাহিকতার ভেতরেই নতুন একটি স্তর যোগ করল।

৩) সময়কাল ও কারা নথিভুক্ত করেছেন

শিলালিপিগুলোকে ১ম থেকে ৩য় শতাব্দী সিই-এর মধ্যে তারিখায়িত করা হয়েছে। এগুলো ২০২৪–২৫ সালের মাঠসমীক্ষায় নথিভুক্ত করেন—

  • শার্লট শ্মিড (French School of Asian Studies/EFEO, প্যারিস)

  • ইনগো স্ট্রাউচ (University of Lausanne)
    এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই ধরনের লেখাকে শুধু “দেয়াল-লেখা” হিসেবে নয়—শাস্ত্রীয় উপায়ে নথিভুক্ত করে ইতিহাস-প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

৪) তামিল নামগুলো কেন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে

গবেষকেরা কয়েকটি তামিল নামের পুনরাবৃত্তি ও ভাষাগত গঠন বিশ্লেষণ করে দেখছেন, এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং নির্দিষ্ট গোষ্ঠী/সম্প্রদায়ের উপস্থিতির ইঙ্গিতও হতে পারে। প্রতিবেদনে সবচেয়ে নজরকাড়া নাম হিসেবে আসে “Cikai Koṟṟaṉ”—যা ৫টি সমাধিতে ৮ বার দেখা গেছে।
এখানে “koṟṟaṉ” অংশটি তামিল মূল “koṟṟam” (জয়/বধ) ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এটি চেরা (Chera) ঐতিহ্য, দেবী Koṟṟavai, এমনকি রাজশিরোপা-ধাঁচের উপাধির ধারণার সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ নামটি কেবল ব্যক্তিনাম নয়—তামিল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতের সঙ্গেও সংযোগ টানে।

৫) বন্দর শহর ছাড়িয়ে “নাইল ভ্যালি”—কেন এটাকে বড় ইঙ্গিত বলা হচ্ছে

ভারত–রোমান বাণিজ্যের বহু প্রমাণ আগে থেকেই ছিল, বিশেষত রেড সি অঞ্চলের বন্দর শহর বেরেনিকে (Berenike)-তে। সেখানকার খননে ভারতীয় বস্তু/লেখা মিলেছে—যা মূলত “বাণিজ্যিক সংযোগ” দেখায়।
কিন্তু এই নতুন আবিষ্কার সমাধিক্ষেত্রের ভেতরের দেওয়ালে নাম-লেখা—এটা বন্দর-শহরের অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রমাণ ছাড়িয়ে সাংস্কৃতিক ভ্রমণ, চলাচল, পর্যটনধর্মী উপস্থিতি এবং পারস্পরিক মেলামেশাকে ইঙ্গিত করে। ফলে আলোচনার কেন্দ্র বন্দর থেকে সরে এসে মিশরের অভ্যন্তরভাগ—নাইল ভ্যালির দিকে যাচ্ছে।

৬) অন্যান্য শিলালিপি ও ইঙ্গিত

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তামিল-ব্রাহ্মীর পাশাপাশি প্রাকৃতসংস্কৃত শিলালিপিও শনাক্ত হয়েছে—যা উত্তর-পশ্চিম ভারতসহ বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের বহুভাষিক উপস্থিতি বোঝাতে পারে।
আরেকটি তামিল-ব্রাহ্মী লেখার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ আছে “Kopāṉ varata kantan”—যার অর্থ বোঝানো হয়েছে “কোপান এসে দেখে গেল”—এ ধরনের বাক্য ভ্রমণকারীর “আমি এখানে এসেছি” ধরনের চিহ্ন হিসেবে ধরা যায়। এছাড়া CātaṉKiraṉ-এর মতো নামও পাওয়া গেছে বলে বলা হয়েছে।

৭) “প্রারম্ভিক বিশ্বায়ন” গবেষণায় এর গুরুত্ব

এই শিলালিপিগুলোকে প্রতিবেদনে “দুর্লভ এপিগ্রাফিক প্রমাণ” বলা হয়েছে—কারণ এগুলো ভারতীয়দের উপস্থিতিকে শুধু বাণিজ্যিক নথি বা বন্দরের বস্তু দিয়ে নয়, বরং ভৌগোলিকভাবে অনেক ভেতরের এক ঐতিহাসিক স্থানে সরাসরি লেখনীচিহ্ন দিয়ে দেখায়।
ফলে “ইন্ডিয়ান ওশান ওয়ার্ল্ড” এবং “মেডিটেরেনিয়ান ওয়ার্ল্ড” কীভাবে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত ছিল—এ নিয়ে নতুন প্রশ্ন ও গবেষণার দিগন্ত খুলছে।


পরীক্ষার জন্য ৬টি ঝটপট পয়েন্ট

  1. স্থান: মিশরের Theban Necropolis-এর Valley of the Kings

  2. সময়কাল: ১ম–৩য় শতাব্দী সিই

  3. ভাষা/লিপি: তামিল-ব্রাহ্মী, প্রাকৃত, সংস্কৃত—মোট প্রায় ৩০টি শিলালিপি।

  4. প্রকৃতি: দর্শনার্থীদের গ্রাফিতি/নাম-লেখা

  5. গুরুত্বপূর্ণ নাম: Cikai Koṟṟaṉ (বহুবার পুনরাবৃত্ত), আরও—Kopāṉ, Cātaṉ, Kiraṉ।

  6. তাৎপর্য: তামিলগম–রোমান বিশ্বের বাণিজ্য/সংস্কৃতির যোগসূত্র এবং মিশরের ভেতরাঞ্চলে ভারতীয় উপস্থিতির বিরল প্রমাণ।

তথ্যসূত্র